শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

তামাশার নির্বাচন ও ইসির দায়

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা
দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্যই স্বাধীনতা অর্জন করলেও আমাদের সে স্বপ্ন আজও অনেকটাই অধরাই রয়ে গেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নির্দলীয় কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে কয়েকটা নির্বাচন ছাড়া কোন নির্বাচনই গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ বা গ্রহণযোগ্য হতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দাবিদারদের বিরুদ্ধেও জনগণের ভোটাধিকার হরণের অভিযোগও রয়েছে। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে একদলীয় বাকশালী শাসন ও প্রতিষ্ঠা এবং গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার গুরুতর অভিযোগও কারো অজানা নয়। রাজনীতিতে দলটির বারবার উত্থান-পতন ঘটলেও তারা অতীতের অশুভবৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। একদিকে তারা জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে, ঠিক তেমনিভাবে রাষ্ট্রীয় সংবিধানের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ একটি গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। গণতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্যই আমরা ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলাম এবং এতে আমরা সফলও হয়েছি। পরবর্তীতে আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধানেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনা (Preamble)-এর তৃতীয় প্যারায় বলা হয়েছে, `Further pledging that it shall be a fundamental aim of the State to realize through the democratic process a socialist society, free from exploitation-a society in which the rule of law, fundamental human rights and freedom, equality and justice, political, economic and social, will be secured for all citizens; ‘আমরা আরো অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা-যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে’। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিনির্মাণ করতে প্রায় ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে। দেশে আইনের শাসনের পরিবর্তে মুজিবীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো বলে তাদের আত্মস্বীকৃতিও রয়েছে। মৌলিক মানবাধিকার; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার ভীষণভাবে পদদলিত হয়েছিল।
স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেশে একদলীয় বাকশালী শাসন কায়েম করেছিলো। গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ; গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা ও সুশাসনের জন্য অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলেও স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করেছে। অথচ গণতন্ত্র সম্পর্কে সংবিধানের à§§à§§ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ÔThe republic shall be a democracy in which fundamental human rights and freedoms and respect for the dignity and worth of the human person shall be guaranteed, and in which effective participation by the people through their elected representatives in administration at all levels shall be ensured.’ অর্থাৎ প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।
স্বাধীনতা পরবর্তীতে গৃহীত সংবিধানে গণতন্ত্রকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে ঘোষণা করা হলেও শাসকগোষ্ঠী বারবারই পবিত্র সংবিধানকে পদদলিত করেছে। দেশে মেয়াদঅন্তে নির্বাচন করা হলেও সেসব নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। ১৯৮২ সালে একটি নির্বাচিত সরকারকে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেই ক্ষমতা দখল করেন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ। মূলত, এ ঘটনার মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের নতুন করে কবর রচনা করা হয়েছিল। এরপর জেনারেল এরশাদের শাসনামলে যত নির্বাচনই হয়েছে সেসব নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি বরং দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে হাসি-তামাশার অনুষঙ্গে পরিণত করা হয়। ধ্বংস করা হয়েছিলো সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে।
এরপর এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতির দাবিতে দুর্বার গণাআন্দোলন গড়ে ওঠে এবং তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদ কেয়ারটেকার সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য হোন। এরপর ১৯৯১ সালে একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির ভিন্ন রূপ নেয়।
এরপরের ইতিহাস কারোরই অজানা নয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পরিকল্পিতভাবেই দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে দেয়। বাতিল করা হয় জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি। আওয়ামী লীগের শাসনামলের তিনটি জাতীয় নির্বাচন ছিল চরম বিতর্কিত ও খেল-তামাশার। একতরফা ও জালিয়াতির এসব নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের বৈধতা নেয়া হয়েছিল মাত্র। এই নির্বাচনগুলোতে ছিল না জনসমর্থন বা জনগণের অংশগ্রহণ। এসব নির্বাচন আয়োজনে বড় ভূমিকা ছিল নির্বাচন কমিশনের। জনআপত্তি উপেক্ষা করে সংশ্লিষ্ট কমিশন সরকারের পক্ষে নির্বাচন আয়োজন করে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে শামিল হয়েছিল তিনটি জাতীয় নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করা নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শুধুমাত্র রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় করে একটি দলকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার অভিযোগের তীর সাবেক তিন কমিশনের সিইসি ও ইসিদের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগে এবার অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। যা খুবই সময়োচিত ও যৌক্তিক।
সূত্র বলছে, জাতীয় নির্বাচনে কী কী অনিয়ম হয়েছে সেসব খোঁজ নেয়া শুরু করেছে সংস্থাটি। এছাড়া নির্বাচন পরিচালনা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের অর্থ তছরুপের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের সম্পদের তথ্যও জানতে চাওয়া হবে বলে জানা গেছে। দুদক সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে নির্বাচনে ব্যবহার করা ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে বিতর্ক ছিল তুঙ্গে। বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের মতামতের ঊর্ধ্বে গিয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনাররা জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের অনুমোদন দেন। এসব মেশিন একপর্যায়ে অকেজো হয়ে পড়ে। হাজার কোটি টাকায় কেনা ইভিএম ব্যবহার করে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ ক্ষতির বিষয়টিও অনুসন্ধানের আওতায় আসতে পারে বলে দুদকের ওই সূত্র নিশ্চিত করেছে।
দুদক সূত্র বলছে, নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম দুর্নীতি কী পরিমাণ হয়েছে এবং এর মধ্যদিয়ে সিইসি-ইসিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতিসাধনের বিষয়ে একটি অনুসন্ধানের পরিকল্পনা রয়েছে দুদকের। সূত্র আরো জানাচ্ছে, পরিকল্পনামাফিক অনেক কাজই দুদক করছে। গত ১৬ বছরে যেসব সেক্টরে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাট হয়েছে সবই আমলে নিয়ে অনুসন্ধান করার চিন্তা করছে। আইন অনুযায়ী সাবেক সিইসি-ইসিদের কোনো অপরাধ প্রমাণ পেলে কমিশন ব্যবস্থা নেবে। শুধু সাবেক সিইসি-ইসিরাই নন। বিতর্কিত নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাষ্ট্রীয় অর্থ তছরুপের মতো অনিয়ম করা সবাইকেই আইনের আওতায় আনা হতে পারে। তবে এটা বিশাল একটি কর্মযজ্ঞ। এখানে কে কোন ভূমিকা পালন করেছেন কীভাবে অনিয়ম হয়েছে সব বের করা সময়সাপেক্ষ বিষয়। সূত্র মতে, গত তিনটি নির্বাচনে মোট কতো কোটি টাকা খরচ হয়েছে এবং কোনো অর্থ বিনা কারণে খরচ হয়েছে কিনা এসব খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে এরই মধ্যে একটি টিম খোঁজ খবর নেয়া শুরু করেছে। যা কমিশনের শুরু হতে যাওয়া অনুসন্ধানটি আরও বেগবান করবে। এ বিষয়ে ইসি সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, তিনটি নির্বাচন বিতর্কিত ছিল এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। একটি পক্ষকে অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় ছাড়া আর কিছুই ছিল না। গত নির্বাচনেও ২২শ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। নির্বাচনে কী কী অনিয়ম হয়েছে সেটা নিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়াধীন।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৪ সালের প্রতিদ্বন্দ্বীহীন ভোটে কাজী রকিবউদ্দিন কমিশন ব্যয় করেছিল ২৬৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ২০১৮ সালে নুরুল হুদা কমিশন সে ব্যয় বাড়িয়ে ৭০০ কোটি টাকা ব্যয় করে। যদিও নির্বাচনে ব্যয় বেড়েছিল আরও বেশি। অন্যদিকে সর্বশেষ ২০২৪ সালে কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশনের আমলে নজিরবিহীন ব্যয় হয়। এতে নির্বাচনের জন্য খরচ হয় প্রায় ২৩শ’ কোটি টাকা। মূলত, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফেরার আড়াই বছর পর সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে আওয়ামী লীগ। দলীয় সরকারের অধীনে ভোটের বিরোধিতা করে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১২৫, জাতীয় পার্টি (জাপা) ২২, জাসদ ২, ওয়ার্কার্স পার্টি ২, জেপি à§§ এবং তরীকত ফেডারেশন একটি আসনে বিনা ভোটে জয়ী হয়। বাকি ১৪৭ আসনে ভোটগ্রহণ করা হয়। দিনভর কেন্দ্র ফাঁকা থাকলেও ভোটের হার দেখানো হয় ৪০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।
‘রাতের ভোট’ খ্যাত ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। সেই নির্বাচনে আগের রাতেই ব্যালটে সিল দিয়ে বাক্স ভরা হয়। অস্বাভাবিক ফলাফলের ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৭৯ দশমিক à§§ শতাংশ এবং বিএনপি à§§à§© দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে বলে দেখানো হয়। বিএনপি পেয়েছিল ছয়টি আসন। আওয়ামী লীগ ২৫৮ ও জাতীয় পার্টি ২২ আসন পায়।
একাদশ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হার দেখানো হয় ৮০ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। যদিও রাতের বেলায় বাক্স ভরার অভিযোগে নির্বাচনের দিন সকালে শতাধিক আসনে ভোট বর্জন করেন বিএনপি নেতৃৃত্বাধীন ঐক্য ফ্রন্টের প্রার্থীরা। চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, ১০৩ আসনের ২১৩ কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। ১ হাজার ২০৫ কেন্দ্রে ভোট পড়ে ৯৬ থেকে ৯৯ শতাংশ। ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ভোট পড়ে ৬ হাজার ৪৮৪ কেন্দ্রে। আর ৮০ থেকে ৮৯ শতাংশ ভোট পড়ে ১৫ হাজার ৭১৯ কেন্দ্রে, যা ছিল অস্বাভাবিক। আওয়ামী লীগের শতাধিক প্রার্থী ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন বলে দেখানো হয়। তখন থেকেই প্রচলিত কথা ছিল রিটার্নিং, সহকারী রিটার্নিং ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নির্বাচনের আগে ব্যালটে সিল দিয়ে ভোটবাক্স বোঝাই করে পুলিশ। যদিও কে এম নূরুল হুদার নির্বাচন কমিশন এবং আওয়ামী লীগ সেই অভিযোগ নাকচ করে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারিতেও বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে আওয়ামী লীগ ডামি প্রার্থী দেয়। নিজ দলীয় নেতাদের মধ্যেই ভোটের আয়োজন করে। সে নির্বাচনের বৈধতা দেন তৎকালীন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় স্পষ্টতই প্রমাণ হয় যে, আওয়ামী সরকারের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে যে তিনটি নির্বাচন হয়েছে সেসব কোন নির্বাচন ছিল না বরং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে নির্বাচনের নামে দেশ ও জাতির সাথে রীতিমত ভাঁওতাবাজী ও প্রহসন করা হয়েছে। সকল ক্ষেত্রেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য সহযোগিতা কমিশনারও আওয়ামী-ফ্যাসিবাদকে অবৈধভাবে টিকে রাখার জন্য তস্করের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার।
অবশ্য কাজী হাবিবুল আউয়াল বিদায় নেওয়ার সময় নির্বাচন কমিশনের সীমাবদ্ধ ও ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করেছিলেন। তার কথার কোন যৌক্তিক ভিত্তি ছিল না। আমাদের সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে অবাধ ক্ষমতা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও কর্মপরিধি সম্পর্কে সংবিধানের ১৮(৪) অনুচ্ছেদে স্পষ্টতই বলা হয়েছে, The Election Commission shall be independent in the exercise of its functions and subject only to this Constitution and any other law. অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবেন।
মূলত, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনভাবেই প্রতিবন্ধক ছিল না বরং প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অপরাপর কমিশনারের দাসপ্রবণ মানসিকতা, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও আওয়ামী-বাকশালীদের লেজুড়বৃত্তিই দেশের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নির্বচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। দুর্বল করে দেয়া হয়েছে জাতিসত্তার ভিত্তিমূলকে। ফলে প্রায় ১৬ বছর ধরে দেশ ও জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছিল স্বৈরাচারের জগদ্দল পাথর। এসব ছিল রীতিমত রাষ্ট্্রদ্রোহিতা। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই প্রহসনের নির্বাচনে সহায়তাকারী সকলের রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে বিচার হওয়া উচিত। অন্যথায় ফ্যাসিবাদ ও মাফিয়াতন্ত্রীরা বারবার ফিরে আসার ছিদ্রপথ খুঁজবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ